১৩০ কোটি ভারতীয় কাঁদছে – শিরোপা জিতলো অস্ট্রেলিয়া

অবশেষে ৬ষ্ঠ বারের মতো বিশ্বকাপ জিতলো অস্ট্রেলিয়া। ভারতকে ৬ উইকেটের ব্যবধানে হারিয়ে ৮ বছর পর আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তুললো তারা। শেষে যখন ৪৩ বলে ২ রান দরকার এবং তা নেয়ার পর অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা যখন দৌড়ে মাঠে ঢুকতেছিলো, পুরো স্টেডিয়াম সাইলেন্ট। ১ লক্ষ ৩০ হাজার ভারতীয় দর্শক স্তব্ধ!

আমি যখন টিভিতে এই দৃশ্য দেখতেছিলাম, আমার কাছে মনে হইছে, এই মুহুর্তে বিশ্বের সবচেয়ে নীরব জায়গা হচ্ছে গুজরাটের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম। ১ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষের চিৎকারে পুরো স্টেডিয়ামে ভূমিকম্প হবার কথা। অথচ, কি সুন্দর পরিবেশ, কোনো হইচই নাই। একটা বিশ্বকাপজয়ী দলের সেলিব্রেশন যে এত্ত নীরব হইতে পারে, জানা ছিলো না।

ভারত বিশ্বকাপের আনবিটেন দল, সেমিফাইনাল পর্যন্ত সবগুলো ম্যাচে জয়। টেনেটুনে-কোনোরকমে জেতা না, বিশাল ব্যবধানে জয় ছিলো প্রত্যেকটা। সবাই বলতেছিলো, ভারত বিশ্বকাপ জিতলে…এইবারেই জিতবে, এই দলটাই জিতবে। সেই দলের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়া ফাইনাল ম্যাচ খেললো এবং জিতলো।

There’s nothing more satisfying than hearing a big crowd go silent!

by Pat Cummins (Australian Cricketer & Captain)

সত্যি বলতে, অস্ট্রেলিয়া ১০ ওভারের পর থেকে ২৫ ওভার পর্যন্ত যেই প্ল্যান সাজাইছে, ইন্ডিয়া এইটা কোনোভাবেই ধরতে পারে নাই তখন। ক্রিকেটের সবচেয়ে অপরিচিত একটা ফিল্ডিং সেটআপ হচ্ছে এইটা। শর্ট স্কয়ার লেগে একজন ফিল্ডার, আবার ডিপ স্কয়ার লেগে ফিল্ডার, ডিপ ফাইন লেগে একজন ফিল্ডার, ডিপ থার্ডে একজন, ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টেও একজন ফিল্ডার। এইরকম ফিল্ডিং-এ আপনি ব্যাটসম্যান হিসেবে যখন থাকবেন, আপনি আশা করবেন ফুল লেন্থ এবং গুড লেন্থের বল। কিন্তু, শর্ট বল দিলে আপনি বাধ্য এই জোনগুলোতেই বল পাঠিয়ে স্কোর করতে। এই ফিল্ডিং সেটাপে যদি বাউন্ডারি মারতে চান, ধরা খেয়ে যাবেন। আউটের চান্স অনেক বেশী।

তারউপর, ১০ ওভারের মধ্যেই আপনার দলের যখন ২টা উইকেট নাই, কোনোভাবেই আপনি চাইবেন না রিস্ক নিয়ে বাউন্ডারি নিতে। অস্ট্রেলিয়া ঠিক এই কাজটাই করছে। ৯৪টা বল থেকে ভারত কোনো বাউন্ডারি পায় নাই। ভিরাট কোহলি এবং লুকেশ রাহুলকে পুরো সময় ডট এবং সিংগেল দিয়েই পার করতে হইছে। কিচ্ছু করার নাই। অস্ট্রেলিয়া এই প্ল্যানটা অসাধারণভাবে বাস্তবায়ন করছে।

৯ ওভার ৩ বলে ৭৬ রান। রোহিত শর্মা যেভাবে স্কোর তুলতেছিলো, বড় সংগ্রহের দিকেই যাচ্ছিলো ভারত। ইভেন তা হইতেই পারতো। গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের বল তুলে মারতে গিয়ে ট্রাভিস হেডের হাতে ক্যাচ আউট রোহিত শর্মা। মূলত এরপরেই অস্ট্রেলিয়ার প্ল্যানমাফিক খেলা শুরু। আর এই ফাঁদে প্রথম শিকার শ্রেয়াস আইয়ার। কোনোকিছু ধরতে পারার আগেই, ইনি ডিফেন্স করতে গিয়ে আউট। তবে, ভিরাট কোহলি এই চাপের ভিতরে থেকেও ঠিকই ফিফটি করেছেন। কিন্তু, তিনিও শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার প্ল্যানের শিকার।

৮ ওভার থেকে ২৫ ওভার পর্যন্ত ভারত কোনো বাউন্ডারি আদায় করতে পারে নি। মূলত এই সময়টাতেই অস্ট্রেলিয়া এগিয়ে গিয়েছে

by Michael Clarke (ex-Australian Cricketer)

শর্ট বলে ডিপ থার্ড ম্যান থেকে সিংগেল নিতে গিয়ে ইনসাইড এজ হয়ে আউট। ৬৩ বলে ৫৪ রান করে তিনি ফিরে গিয়েছেন। অবশ্য আরেক ব্যাটসম্যান লুকেশ রাহুলও ফিফটি করেছেন। ১০৭ বলে ৬৬ রান। মিডল অর্ডারে থাকা আলরাউন্ডার রবীন্দ্র জাদেজা এবং সুরিয়াকুমার ইয়াদাভ এইদিন একেবারেই ফ্লপ। পারফর্ম করার চান্সই দেয় নাই অস্ট্রেলিয়া। শেষপর্যন্ত ভারত ২৪০ রান স্কোর করতে পারছিলো। সো, টার্গেট ২৪১ রান।

এইরানের টার্গেটে ব্যাটিং করতে নেমেও অস্ট্রেলিয়ার শুরুটা মোটেও ভালো হয় নাই। ৪৭ রানে টপ অর্ডারের ৩টা উইকেট নাই। ডেভিড ওয়ার্নার, মিচেল মার্শ এবং স্টিভেন স্মিথ। যদিও স্মিথের আউটটা নিয়ে খুবই হতাশ আমি। বলের ইমপ্যাক্ট অফ স্ট্যাম্পের বাইরে ছিলো এবং তা স্পষ্ট। বুমরাহ আউট চাইতেই আম্পায়ার দিয়ে দিলো। মানে আম্পায়ার, চিন্তাও করে নাই। এই আউটটা দেখে, আমি একেবারে অবাক। আরও অবাক হইছি, স্টিভেন স্মিথ যখন ট্রাভিস হেডকে জিজ্ঞেস করলো, উনিও বললো আউট। যাস্ট এইকারণেই স্মিথ রিভিউ নেয় নাই।

ট্রাভিস হেড যদি সেঞ্চুরি না করতো এবং অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটা না জিততো, তাহলে যে কি হইতো! ট্রাভিস হেড আজীবন আফসোস করতো। আসলে একটু ক্লিয়ারলি যদি তাকান, তাহলে দেখবেন বলটা ইমপ্যাক্ট হইছিলো স্মিথের ডান পায়ে, অর্থ্যাৎ পিছনের পায়ে। এমনকি, বলটা ইনসুইং ছিলো। যেকারণে ট্রাভিস হেড ভাবছে, বল হয়তো উইকেট এরিয়ায় ঢুকে গেছে। ওই সময়ে ট্রাভিস হেড ননস্ট্রাইকের যে সাইডে দাঁড়ানো ছিলো, ওই পাশ থেকে প্রপার ইমপ্যাক্টটা বুঝা যায় নাই। যেকারণে, স্মিথের পিছনের পা ওনার ব্লাইন্ড জোন। তা না হলে, স্টিভেন স্মিথের আউটের রিভিউ ট্রাভিস হেড কেন নিবেন না?

ট্রাভিস হেড এবং মার্নাস লাবুশাইনের ১৯২ রানের পার্টনারশিপ ৪র্থ উইকেট জুটিতে সর্বোচ্চ!

by International Cricket Council

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত এই ট্রাভিস হেড দায়িত্ব নিয়ে এই গ্যাপটা ফিলাপ করছেন। মার্নাস লাবুশাইনকে সাথে নিয়ে করছেন ১৯২ রানের পার্টনারশিপ। ক্রিকেটের যেকোনো ৪র্থ উইকেট জুটিতে এই পার্টনারশিপ অন্যতম সেরা। কালকের ম্যাচের সিচুয়েশনে এইরকম একটা পার্টনারশিপ আসলেই দরকার ছিলো অস্ট্রেলিয়ার জন্য।

নিজের সেরাটা দিয়ে খেলছেন ওপেনার ট্রাভিস হেইড, সেঞ্চুরি করেছেন ৯৫ বলে। শেষ পর্যন্ত মার্নাস লাবুশাইন ১১০ বলে ৫৮ রানে নটআউট। ট্রাভিস হেইড যখন ১২০ বলে ১৩৭ রানে আউট হয়ে ফিরে যাচ্ছিলো, তখন অস্ট্রেলিয়ার দরকার ছিলো ৪৩ বল থেকে মাত্র ২ রান। গ্লেন ম্যাক্সওয়েল এসেই ডিপ স্কয়ার লেগে শট এবং অস্ট্রেলিয়া জিতলো। অসাধারণ একটা ম্যাচ দেখলাম। শুভ কামনা অস্ট্রেলিয়ার জন্য। ইভেন, ফিলিং গুড ফর দেয়ার ভিক্টোরি।

বিস্তারিত ভিডিওতে…

You Might Also Like

Leave a Reply